• পরমাণু বিজ্ঞানী হতে চান উচ্চ মাধ্যমিকে নবম হওয়া শুভঙ্কর
    এই সময় | ১৭ মে ২০২৬
  • মা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। এলাকায় অনেকেই অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারেন না। ছেলে তাঁদের বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসা করবে, এটাই চেয়েছিলেন মা। কিন্তু ছেলে চান বিজ্ঞানী হতে। এমন কোনও প্রযুক্তির উদ্ভাবন করতে, যা কি না সহজেই গরিব মানুষের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেবে। আঁধারে বাঁচার কষ্ট কতটা, তা বিলক্ষণ জানেন তিনি। তাই পরমাণু বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন মনের মধ্যে পুষে রেখেই পরের লক্ষ্য স্থির করেছেন উচ্চ মাধ্যমিকে নবম স্থানাধিকারী শুভঙ্কর সামন্ত।

    শুভঙ্কর পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ের বাসিন্দা। এ বার তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার পরমানন্দপুর জগন্নাথ ইনস্টিটিউশন থেকে। মাধ্যমিক পাশ করার পরেই বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ জন্মায় শুভঙ্করের। বাড়ির সামনে যে স্কুল ছিল, সেখানে বিজ্ঞান পরিকাঠামোই নেই। পছন্দের পদার্থবিজ্ঞানই ছিল না শিক্ষকের অভাবে। ফলে বাড়ি থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে, মামার বাড়ির কাছের একটি স্কুলে ভর্তি হতে হয় তাঁকে। মাঝে মাঝে মামার বাড়ি থেকেই স্কুলে যেতেন। কখনও কখনও সবংয়ের বাড়ি থেকেও যেতে হয়েছে। তখন সাইকেলেই ৮ কিলোমিটার পথ উজিয়ে স্কুলে গিয়েছেন শুভঙ্কর।

    স্কুলে ভর্তি হওয়া তো হলো। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়ের জন্য দরকার গৃহশিক্ষক। কিন্তু মাসে মাসে দেড়-দু’হাজার টাকা দিয়ে ছেলে টিউশন পড়ানোর সামর্থ্য ছিল না বাবা নবকুশ সামন্তের। শুভঙ্কর বলেন, ‘আমাদের অত সামর্থ্য ছিল না। অত অত টাকা দিয়ে প্রাইভেট টিউশন নেওয়া যায় নাকি! পরে একজন গৃহশিক্ষকের খোঁজ পেলাম। উনি অনেক কম টাকায় পড়িয়েছেন। বয়স্ক মানুষ। অনেকেই বলত, কেন ভালো টিচারের কাছে পড়ছি না? আজ দেখুন, সেই শিক্ষকের কাছে পড়েই এত ভালো ফলাফল হলো। আসলে সবই মনের জোর।’ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পদার্থবিদ্যায় ৯৭ পেয়েছে শুভঙ্কর। আর গণিত ও রসায়নে ৯৮ নম্বর করে। পাঁচশোয় সব মিলিয়ে ৪৮৮!

    যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সির মতো বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ভবিষ্যতে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়াশোনা করতে চান শুভঙ্কর। বলেন, ‘ফিজ়িক্স নিয়ে পড়তে চাই। সেই চেষ্টা করছি এখন।’ কিন্তু কেন ফিজ়িক্স? শুভঙ্কর বলেন, ‘এই বিষয়টা আমার খুব ভালো লাগে। পরমাণু বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে চাই আমি। পরমাণু বিজ্ঞান এমন একটা বিষয়, যাতে ভবিষ্যতে মানুষের অনেক উপকার হতে পারে। পরমাণু প্রযুক্তি দিয়ে জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব। তা-ই ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ এনে দেবে।’

    ছেলের এই স্বপ্নপূরণে যাতে কখনও কোনও বাধা তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর বাবা নবকুশ। তিনি নিজেও গৃহশিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি চাষবাসও করেন। নবকুশ বলেন, ‘ও (শুভঙ্কর) যা হতে চায়,তাই হোক। বড় মানুষ হোক, বাবা হিসাবে এটুকুই চাই। ওর মা চেয়েছিল, ও ডাক্তার হোক। গরিব মানুষেক চিকিৎসা করুক বিনাপয়সায়। কিন্তু ছেলে যে স্বপ্ন দেখেছে, তা-ও খুব বড়। এই স্বপ্নপূরণে আমরা কোনও ত্রুটি রাখব না।’

    নবকুশ জানান, কলকাতার এক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও শুভঙ্করের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাঁকে নানা ভাবে পড়াশোনায় সাহায্য করেছে। ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সম্পাদক সৌরভ বিশ্বাস বলেন, ‘ওর মধ্যে অসীম সম্ভাবনা যে রয়েছে, তা আমরা প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলাম। আমরা ওর বাড়ি গিয়েছিলাম ওর সঙ্গে দেখা করতে। গিয়ে আমরা বুঝতে পারি, খুবই সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে ওর বাড়ির লোক যে ভাবে ওর ভবিষ্যতের জন্য সদাসচেষ্ট, তা সত্যিই শিক্ষণীয়।’

  • Link to this news (এই সময়)