• উচ্চমাধ্যমিকের একমাত্র রূপান্তরকামী পড়ুয়া, ঝাড়গ্রামের অনুভবই আজ আলিয়া
    প্রতিদিন | ১৭ মে ২০২৬
  • অন্তর আর বাহিরের টানাপোড়েনে দীর্ঘদিন বিধ্বস্ত ছিল সে। তার উপর ছিল সমাজের অবজ্ঞা, উপহাস, অসহযোগিতা। কিন্তু গানের কথার মতোই – “আমার হাত বাঁধবি, পা বাঁধবি, মন বাঁধবি কেমনে।” তাই সমস্ত বাধা অতিক্রম করে আজ সে নিজের মনের আলোয় নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছে। পুরুষ শরীরের গণ্ডি ভেঙে নারীসত্ত্বার প্রকাশ ঘটাচ্ছে সে। অনুভব থেকে আজ সে ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে আলিয়া।

    এই রূপান্তরের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ঝাড়গ্রাম (Jhargram) শহরের বামদা এলাকার বাসিন্দা আলিয়া এ বছর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যের একমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নেয়। ঝাড়গ্রামের ননীবালা বালিকা বিদ্যালয় থেকে ৬৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সে। পারিবারিক বাধা, অল্প বয়সে মায়ের মৃত্যু, বাবার দ্বিতীয় বিয়ে – জীবনের একের পর এক আঘাত সামলেও নিজের মনের কথাকেই শেষ পর্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে আলিয়া।

    চিকিৎসার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার শরীরে ফুটে উঠছে নারীত্বের লক্ষণ। যখন পরিবার ও সমাজের একাংশের কাছে নিজেকে অবাঞ্ছিত বলে মনে হয়েছিল, তখন পাশে দাঁড়িয়েছিল ননীবালা বিদ্যালয়। প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে অন্যান্য শিক্ষকরাও তাকে সহযোগিতা ও ভালোবাসা দিয়েছেন। বিদ্যালয়ে শাড়ি পরে অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে একসঙ্গেই ক্লাস করেছে সে। সহপাঠীরাও বাড়িয়ে দিয়েছে সহযোগিতার হাত।

    মাত্র দশ বছর বয়সেই অনুভব বুঝতে শুরু করেছিল, সে অন্য ছেলেদের মতো নয়। মাঠ, ফুটবল বা ক্রিকেট কোনও কিছুই তাকে টানত না। বরং মেয়েদের সঙ্গে পুতুল খেলা, রান্নাবাটি খেলাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ লাগত। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত সৃজনশীল আলিয়া মাটি ও সিমেন্ট দিয়ে প্রতিমা গড়া কিংবা বিভিন্ন হাতের কাজে পারদর্শিতা দেখিয়েছে। কৈশোর থেকেই নিজের খরচ নিজেই চালায় সে। বর্তমানে বামদায় ঠাকুমার সঙ্গে ছোট্ট একচিলতে বাড়িতে থাকে। সংসারের খরচ থেকে শুরু করে নিজের চিকিৎসার ব্যয় – সবটাই বহন করার চেষ্টা করে একাই।

    তার ঠাকুমা অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করেন। ২০১৯ সালে মা পাপিয়া পালকে হারায় অনুভব। তখন সে বাবার সঙ্গে শহরের শ্রীরামপুর এলাকায় থাকত। বাবা মিঠুন পাল পেশায় ঠিকাদার। মায়ের মৃত্যুর পর অনুভব যখন পরিবারকে জানায় যে সে নারী হতে চায়, তখন প্রবল আপত্তির মুখে পড়তে হয় তাকে। বাবার অসম্মতির জেরে ঘর ছাড়তে বাধ্য হয় সে। ২০২২ সালে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তার আগেই অনুভব বাছুরডোবায় মাসি পিয়ালী সাহুর কাছে থাকতে শুরু করে এবং তাঁর কাছেই নৃত্যের প্রশিক্ষণ নেয়। কিন্তু বছর দেড়েক পর সেখানে মনোমালিন্যের কারণে সেখান থেকেও বেরিয়ে আসতে হয় তাকে। এরপর পাকাপাকিভাবে বামদায় ঠাকুমার কাছেই থাকতে শুরু করে।

    প্রথমদিকে ঠাকুমা গঙ্গা পাল নাতির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। পরে ধীরে ধীরে বুঝেছেন, নাতির ভালো থাকার জন্য তার ইচ্ছাকে সম্মান জানানোই জরুরি। বর্তমানে তিনিই আলিয়ার সবচেয়ে বড় ভরসা। ২০২৪ সালে বানীতীর্থ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৫০ শতাংশ নম্বর নিয়ে উত্তীর্ণ হয় আলিয়া। এরপরই মনোবিদের পরামর্শ নিয়ে শুরু করে জেন্ডার ট্রানজিশনের চিকিৎসা। এখনও পর্যন্ত প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে চিকিৎসার পিছনে। আলিয়ার কথায়, দেশের প্রথম রূপান্তরকামী কলেজ অধ্যক্ষ মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়-কে দেখেই সে অনুপ্রাণিত হয়েছে।

    আদালতে অ্যাফিডেভিট করে সে এখন আইনিভাবেও আলিয়া। আধার কার্ডে তার লিঙ্গ হিসেবে ‘মহিলা’ উল্লেখ রয়েছে।উচ্চমাধ্যমিকের পর এখন তার ইচ্ছা, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসুয়াল আর্ট নিয়ে পড়াশোনা করার। কিন্তু আর্থিক অনটনই এখন সবচেয়ে বড় বাধা। চিকিৎসার খরচ ও পড়াশোনার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। অর্থাভাবে ভবিষ্যতে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তাড়া করে ফিরছে।

    আলিয়া আর পুরনো পরিচয়ে ফিরতে চায় না। তার কথায়, “দশ বছর বয়স থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম আমার শরীর আর মন এক নয়। কিন্তু কাউকে বলতে পারিনি। দীর্ঘদিন প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভুগেছি। মা মারা যাওয়ার পর মনে হয়েছিল, আর হারানোর কিছু নেই। বাবা-সহ পরিবারের শত আপত্তি অতিক্রম করে আজ আমি নিজেকে মুক্ত ও স্বাধীন মনে করছি। চিকিৎসা চলছে। এরপর অস্ত্রোপচারও হবে।”

    ননীবালা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুক্তিপদ বিশুই বলেন, “ভর্তির সময়ই অনুভব আমাদের সবটা জানিয়েছিল। আমরা সবসময় নজর রাখতাম যাতে কোনওভাবে ও ট্রোল বা অপমানের শিকার না হয়। ওর কাছ থেকে তেমন কোনও অভিযোগও পাইনি। বিদ্যালয়ের নৃত্য ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও নিয়মিত অংশ নিত।”

    আলিয়ার ঠাকুমা গঙ্গা পাল বলেন, “প্রথমদিকে একটু অস্বস্তি ছিল। পরে বুঝলাম, ওর ভালো থাকার জন্য পাশে দাঁড়ানো দরকার। ও যেটা ভালোবাসে, সেটাই করুক। আর্থিক সাহায্য পেলে ওর পড়াশোনার অনেক সুবিধা হবে।” অনুভব থেকে আলিয়া হয়ে ওঠার দীর্ঘ যাত্রাপথ তাকে কঠোর করে তোলেনি। বরং আরও সংবেদনশীল করেছে। কোমল হাতে সে আঁকে মায়ের চোখ, গড়ে তোলে প্রতিমা, আবার ছোটদের নাচও শেখায়। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হয়ে নিজের মতো লড়াই করা আরও অনেক মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে চায় আলিয়া।
  • Link to this news (প্রতিদিন)