• প্রয়াত আজকাল কর্মী শ্যাম সুন্দর ভট্টাচার্য
    আজকাল | ১৭ মে ২০২৬
  • নামি ব্যক্তি, তারকাদের অবিচুয়ারি বা শোকলিপি লেখা সাংবাদিকদের কাজের স্রেফ আরেকটি ঘর। পেশার দাবিতেই অনেক সময় তা আগেভাগে তৈরি করে রাখতে হয় অথবা মৃত্যুসংবাদ পাওয়ামাত্রই ঝটপট ল্যাপটপ অন করে বসে পড়তে হয়। রুথলেস ভাবেই। তখন আবেগের কোনও জায়গা থাকে না। কিন্তু বহুদিনের পাশে বসা ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর আচমকা মৃত্যুর খবর শুনে, দগদগে হৃদয়ের ঘা নিয়ে লিখতে বসলে তা তো আর শোকলিপি থাকে না, হয়ে যায় স্মৃতিচারণা। সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে একরাশ যন্ত্রণা, আক্ষেপ। সাংবাদিকতার নির্মমতাকে এক লহমায় হারিয়ে দেয় আবেগ। 

    শ্যাম সুন্দর ভট্টাচার্য। ২০২০ সাল থেকে আজকাল ডট ইন-এর গ্রাফিক্স ডিজাইনার। খাতায় কলমে। কিন্তু সংস্থার সব তলার কর্মীদের কাছে 'শ্যামদা' ছিলেন তাঁর থেকে অনেক বেশি কিছু। ১৫ মে, শুক্রবার গভীর রাতে আচমকা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সবার অগোচরে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। শুক্রবারও হইহই করে নিউজরুমে বসে কাজ করেছেন, আজকাল ডট ইন-এর সাংবাদিকদের লেখা খবরের জন্য ফরমায়েশি ছবি তৈরি করে দিয়েছেন। সেসব পছন্দ না হলে আবার নতুন করে বানিয়েছেন। ফুরফুরে মেজাজে বাড়ি ফিরেই বুকে শুরু যন্ত্রণা। যতক্ষণে বাড়ির লোক টের পেয়েছে, বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে। তবু বেসরকারি থেকে সরকারি হাসপাতাল -অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ছোটাছুটি করতে কসুর করেননি শ্যামদার পরিবার। প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা, মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে কলকাতার উপকণ্ঠ থেকে শহরের দক্ষিণ, পূর্ব এফোঁড়-ওফোঁড় করে ছুটেছিল অ্যাম্বুলেন্স। সঠিক পরিষেবা পাওয়ার জন্য। তবু শেষরক্ষা হয়নি। নির্দিষ্ট হাসপাতালর চত্বরের চৌকাঠ যতক্ষণে পেরিয়েছে সেই অ্যাম্বুলেন্সের চাকা, ততক্ষণে শ্যামদা ঘুমিয়ে পড়েছেন চিরদিনের মতো। সামান্য যন্ত্রণা, শ্বাসকষ্টকে শেষ সঙ্গী করেই। 

    আজকাল ডট-ইন-এর স্মোকিং জোনে শ্যামদাকে ক'বার দেখা গিয়েছে, তা হাতে গুণে বলে দেওয়া যায়। তার মানে মোটেই এই নয় যে শ্যামদা আড্ডাবাজ ছিলেন না। যেসব সাংবাদিকদের মর্নিং ডিউটি, তাঁরা শ্যামদার চুটকি, মজাদার কাণ্ডকারখানার সঙ্গে দুরন্তভাবে পরিচিত। ঠিক যেমনভাবে ডে-ডিউটির সাংবাদিকরা পরিচিত শ্যামদার বিখ্যাত একটি সংলাপের সঙ্গে। কোনও গ্রাফিক্স যদি পছন্দ না হতো কারও, মুখে সামান্য বিরক্তি এবং ঠোঁটের কোনায় হাসি টেনে শ্যামদা বলে উঠতেন, “ভাই, যা করেছি যথেষ্ট! আর কী কী চাই? তাজমহল, লাল কেল্লা সব ঢোকাতে হবে নাকি?” আমি নিজেই গ্রাফিক্স নিয়ে কম জ্বালিয়েছি নাকি শ্যামদাকে! 

    ভালবাসতেন সবাইকে। উদারভাবে। ছোটদের অপরিমিত স্নেহ। প্রায় ৬০ ছুঁতে চলা ছ’ফুটিয়া শ্যামদার কাঁধে তাই অনায়াসে হাত রাখতে পারতাম। জড়িয়ে ধরতে পারতাম কোনও গ্রাফিক্স মনে ধরলে। মাসের শেষে মানিব্যাগের ওজন হালকা-হালকা লাগলে আবদার করতে পারতাম – “একটু বাইকে ছেড়ে দেবে বাড়িতে?” কোনওদিন সেই অনুরোধ ফেরায়নি শ্যামদা। নিউজরুমে শ্যামদার সঙ্গে করা আমার দুষ্টুমিতে মাঝেমধ্যে কোনও সহকর্মী বিস্ময় প্রকাশ করলে, উল্টে তাঁদেরই চুপ করিয়ে দিতেন তিনি। চোখ টিপে নিজের ডেস্ক থেকে খানিক মাথা ঝুঁকিয়ে, গলার আওয়াজ ঈষৎ ছড়িয়ে বলে উঠতাম –“শ্যাম, তুমি সুন্দর!”  ওপাশ থেকে আসত তখন একগাল চেনা হাসি। 

    শনিবার থেকে ছুটির দরখাস্ত করেছিলেন। সেই ছুটি যে সারাজীবনের জন্য, তা টের পায়নি কেউ-ই! রাজপুর শ্মশানের চুল্লির ট্রলিতে শ্যামদার নিথর দেহ যখন সবার সঙ্গে হাত লাগিয়ে রাখলাম, ততক্ষণে পুরোহিতের মন্ত্র থেমে গিয়েছে। অদ্ভুত নিঃস্তব্ধতা চারপাশে। আশেপাশে নেই আর একটি শবদেহও। নেই কোনও কোলাহল। আচমকা সেই নিঃস্তব্ধতা ভেঙে খান খান করে উঠল কোকিলের ডাক। ডেকেই চলল একটানা। 

    শ্যামের প্রস্থানে বাঁশির সুর না থাকুক, না-ই বা রইল রাজকীয় কুচকাআওয়াজ, প্রকৃতি কিন্তু এই সহজ মানুষটির বিদায়বেলায় সুরের আবহ তৈরি করতে এতটুকু ভুল করেনি। 

    ওই যে “শ্যাম, তুমি সত্যিই সুন্দর!” 
  • Link to this news (আজকাল)