• ‘ভাঙড়ের মানুষ বেইমান...’, ভোটে হেরে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ‘অভিমানী’ শওকত
    এই সময় | ১৭ মে ২০২৬
  • প্রশান্ত ঘোষ, জীবনতলা

    কবি সত্যেন্দ্রনাথ বসু তাঁর ‘শাহজাহান’ কবিতায় আগ্রা ফোর্টে বন্দি মোঘল সম্রাট শাহজাহানের করুণ দুর্দশার কাহিনি অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে তুলে ধরেছিলেন। রাজ্যপাট হারানোর পরে জীবনের অন্তিম দিনগুলো কার্যতই নিঃসঙ্গ ছিলেন সম্রাট শাহজাহান। ক্যানিং পূর্বের এক সময়ের দাপুটে তৃণমূল নেতা শওকত মোল্লার অবস্থা এখন অনেকটা সেরকমই। ভোটে হারার পরে ক্যানিংয়ের মৌখালিতে নিজের বাড়িতে এখন স্বেচ্ছা নির্বাসনে দিন কাটাচ্ছেন শওকত।

    কিছুদিন আগেও শওকতকে বলা হতো ক্যানিংয়ের বেতাজ বাদশা। তাঁর‌ দাপটে বাঘে হরিণে একঘাটে জল খেত। তাঁকে সবসময় ঘিরে থাকতেন কয়েকশো অনুগামী। প্রশাসনের লোকেরাও তাঁকে সমঝে চলতেন। ভোটের ফল বেরোনোর পরই সেই শওকত চলে গিয়েছেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে। বাড়িতে অনুগামী, কর্মী–সমর্থকদের ভিড় নেই। কেউ একবার ফোন করেও তাঁর খোঁজ নিচ্ছেন না। ভোটের সময় জুটেছে ‘মাছ চোর’–এর অপবাদ। তবে সেটা তাঁকে যতটা না বিচলিত করছে, তার থেকেও বেশি যন্ত্রণা দিয়েছে ভোটের পরাজয়।

    ভোটে হারার পরে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত শওকত ‘এই সময়’–এর কাছে তাঁর ক্ষোভ উগরে দিলেন। তাঁর কথায়, ‘ভাঙড়ের মানুষ বেইমান, বেইমান আমার দলের কর্মীরাও। তাঁরাই চক্রান্ত করে আমাকে হারিয়েছে।’ শওকতের দাবি, ভাঙড়ের জন্য আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি কিছুই করেনি। কিন্তু তিনি গত আড়াই বছরে ভাঙড় বিধানসভা এলাকায় কয়েকশো কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করেছেন। প্রত্যন্ত গ্রামে স্ট্রিট লাইট বসিয়েছেন। মোট ২১ হাজার পাকা বাড়ি করে দিয়েছেন। তাঁর আক্ষেপ, ‘এত কিছু করার পরেও ভাঙড়ের মানুষ আমাকে ভোট দেয়নি। তাঁরা নওশাদকেই ভোট দিয়েছেন। আমার দলের নিচুতলার কর্মীরা, যাঁরা আমার খেয়েছে, পরেছে, তাঁরাই আইএসএফের সঙ্গে গোপন আঁতাঁত করেছিল। ভাঙড়ের সবাই বেইমানি করেছে আমার সঙ্গে।’

    ক্যানিং পূর্বের শওকত ঘনিষ্ঠ এক তৃণমূল নেতার কথায়, ‘দাদা যা বলছেন, একদম ঠিকই বলছেন। উনি নিজের পরিবার ভুলে নিজের বিধানসভা ছেড়ে ভাঙড়ে পড়েছিলেন। দিন–রাত পরিশ্রম করে সবকটি পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে নিয়ে এসেছিলেন। ভাঙড়কে এনকেডিএ–র আওতায় নিয়ে এসে নতুন রূপ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাঙড়ের মানুষ উন্নয়ন পছন্দ করেন না, তাঁরা সাম্প্রদায়িক শক্তিকেই বেছে নিয়েছেন।’

    ক্যানিং পূর্বের একেবারে শেষপ্রান্ত মৌখালিতে সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়ি শওকতের। চারপাশে ফাঁকা জমি ও মেছো ভেড়ি। তার মাঝখানে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা সুবিশাল তিনতলা বাড়ি। এক সময় সেখানে লোকজন গিজ গিজ করত। শওকতের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য ভোর থেকে লোকজন বাড়ির সামনে লাইন দিতেন। এখন ভুল করেও সেখানে কেউ পা মাড়াচ্ছে না। গোটা এলাকা শুনশান।

    এক সময় প্রয়াত সিপিএম নেতা রেজ্জাক মোল্লার ডান হাত বলে পরিচিত ছিলেন শওকত মোল্লা। ২০০৮ ও ২০১৩ সালে ক্যানিং ২ নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হন শওকত। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পরে শওকত সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন। এরপরে ২০১৬ এবং ২০২১–তে পরপর দু’বার ক্যানিং পূর্ব থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। কিন্তু এ বার ক্যানিং পূর্বের পরিবর্তে ভাঙড়ে তাঁকে প্রার্থী করে দল। প্রায় ৩২ হাজার ভোটের নওশাদ সিদ্দিকির কাছে পরাজিত হয়েছেন তিনি। শকতের যেখানে বাড়ি সেই ক্যানিং পূর্ব আসনে অবশ্য তৃণমূলই জিতেছে। তা সত্ত্বেও ঘর থেকে বেরোতে পারছে না শওকত। শওকতের খাসতালুক বলে পরিচিত ক্যানিংয়ের জীবনতলায় তৃণমূলের সমস্ত পার্টি অফিস দখল করে নিয়েছে আইএসএফ কর্মী–সমর্থকরা। ভোটের আগেই শওকতের নিরাপত্তা তুলে নিয়েছে পুলিশ। এই অবস্থায় ঘরের বাইরে বেরোলেই হামলার আশঙ্কা করছেন তিনি।

    তবে কি এ বার রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নেবেন শওকত? তাঁর বক্তব্য, ‘এখনই দুম করে কোনও সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। দল আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। অনেক লড়াই সংগ্রাম করে এই জায়গায় পৌঁছেছি। রাতারাতি সবকিছু ছেড়ে দূরে সরে যেতে পারব না।’ শওকত ব্যাকফুটে চলে যাওয়ায় খুশি তাঁর রাজনৈতিক শত্রু তথা আইএসএফ নেতা আরাবুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাকে রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া করতে গিয়ে আজ উনিই সবকিছু হারিয়ে ফেলেছেন। আর কোনও দিন রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন না মৌখালির মাছ চোর।’

  • Link to this news (এই সময়)