• পড়াশোনার টোপ দিয়ে পাচার, অকথ্য অত্যাচারও! ১০ দিন ধরে সিকিমে ঘুরে মেয়েকে উদ্ধার বাবার
    এই সময় | ১৭ মে ২০২৬
  • এই সময়, আলিপুরদুয়ার: প্রায় দেড় মাস পরে যখন মেয়েকে দেখেন, তখন আর কান্না চেপে রাখতে পারেননি বাবা। দু'চোখের তলায় রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কালশিটে দাগ। ১৩ বছরের ফুটফুটে মেয়েটিকে যে নৃশংস ভাবে অত্যাচার করা হয়েছে, তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি তাঁর। অথচ মেয়েটিকে ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে পড়াশোনা শেখানো হবে, সুস্থ জীবন দেওয়া হবে- এমনই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল!

    আলিপুরদুয়ারের সোনাপুর পুলিশ ফাঁড়ির অন্তর্গত একটি চা-বাগান সংলগ্ন এলাকায় একচিলতে ভাঙা বাড়িতে থাকত মেয়েটি। বাবা দিনমজুর। মা বাড়ির কাজ সামলান। কিশোরীকে ভালো ভাবে পড়াশোনা করানো তো দূর, ঠিক করে দু'বেলা খেতে দিতেই হিমশিম খেতেন বাবা-মা। চলতি বছর এপ্রিলে ওই এলাকার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী দেবী ওরাওঁ যুবকের কাছে গিয়ে মেয়েকে তাঁর হাতে তুলে দিতে বলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, সিকিমের সিমথাংয়ে একটি বাড়িতে মেয়েকে রেখে ভালো স্কুলে ভর্তি করানো হবে। ভালো খাবার, পোশাক দেওয়া হবে। সুন্দর জীবন পাবে কিশোরী। বাবার অভিযোগ, দেবী ওই এলাকায় পরিচিত হওয়ায় তাঁর কথায় বিশ্বাস করে গত ৪ এপ্রিল মেয়েকে সিকিমে যেতে দেন। তার পরে ভোট মিটে গেলেও মেয়ের সঙ্গে একদিনের জন্য কথা বলতে পারেননি। অভিযোগ, দেবীকে ফোন করে মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বারবার নানা টালবাহানা করে এড়িয়ে যেতেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ওই কর্মী।

    ভোটের ফল প্রকাশ হতেই ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙে বাবার। ৫ মে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সিংথামের উদ্দেশে। মেয়ে কোথায় রয়েছে, তা জানা ছিল না তাঁর। তাই সঙ্গে একটি একটি ছবি নিয়ে টানা ১০ দিন ধরে খুঁজে বেড়ান পাহাড়ি ওই এলাকায়। শেষমেশ সিংথামে স্থানীয় কয়েকজনের সাহায্যে একটি বাড়ি থেকে কিশোরীকে উদ্ধার করেন বাবা। মেয়ের শরীরের নানা জায়গায় কালশিটে দাগ দেখে শিহরিত হয়ে ওঠেন তিনি। তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে ফিরে শুক্রবার আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে ভর্তি করান। কিশোরী বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন।

    বাবার অভিযোগ, পড়াশোনা করানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর মেয়েকে পাচার করে দিয়েছিলেন দেবী। তিনি আদতে একজন আড়কাঠি! মেয়েটি ফিরে বাবাকে জানিয়েছে, পড়াশোনা তো দূর, ওই বাড়িতে তাকে পরিচারিকার কাজ করানো হতো। চলত শারীরিক নিগ্রহ। আরও অভিযোগ, দিনের পর দিন তাকে একবেলা আধপেটা রাখা হতো। শুতে দেওয়া হতো মেঝেতে! অত্যাচার সহ্য করতে না-পেরে মাঝেমধ্যেই অচৈতন্য হয়ে পড়ত মেয়েটি। বাবা বলেন, 'দেবী ওরাওঁকে নিজের বোনের মতো ভাবতাম। তাই বিশ্বাস করে মেয়েকে ওঁর হাতে সপে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ওখানে গিয়ে আমার মেয়েটা পড়াশোনা শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে। এ কী হলো!'

    জেলা হাসপাতালে ভর্তি করার পরে কিশোরীকে দেখে আঁতকে ওঠেন কর্তব্যরত চিকিৎসক পবিত্র রায়। তিনি বলেন, 'মেয়েটিকে বিশ্রী ভাবে মারধর করা হয়েছে। ওর শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এর জেরে মেয়েটির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারত। এখন চিকিৎসা হওয়ায় আপাতত তার অবস্থা স্থিতিশীল।' ওই দিনই আলিপুরদুয়ার থানায় সিংথামের ওই পরিবারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন বাবা। ঘটনার পরে থেকেই বেপাত্তা দেবী। তাঁর মোবাইল ফোন সুইচড অফ। ঘটনায় কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন জেলার পুলিশ সুপার অমিতকুমার শাহ।

  • Link to this news (এই সময়)