আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র। গোটা রাজ্যের ভোট মিটে, ফলাফল সামনে এলেও, ফলতায় ভোট এখনও হয়নি। বরং সরকার বদলে সঙ্গে সঙ্গেই সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন একেবারেই বদলে গিয়েছে। কয়েক মাস আগেও যে এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো, বর্তমানে সেখানে অনেকটাই বদল এসেছে বলে রাজনৈতিক মহলের দাবি। স্থানীয় সূত্রের খবর, এলাকায় এখন বিজেপির প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে এবং রাজনৈতিক সমীকরণও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গীর খান ওরফে ‘পুষ্পা’-র রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
তবে জাহাঙ্গীরের বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের সুরই স্পষ্ট। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, বিরোধীদের অভিযোগ কিংবা সংগঠনের কিছুটা চাপ— সবকিছুর মাঝেও তিনি দাবি করছেন, সাধারণ মানুষের সমর্থন এখনও তাঁর পাশেই রয়েছে। তাঁর কথায়, ফলতার মানুষ এখনও তাঁকে বিশ্বাস করেন এবং আগামী দিনেও সেই সমর্থন বজায় থাকবে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, বর্তমানে ফলতায় বিজেপির সংগঠন আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ভোটের প্রচার থেকে শুরু করে এলাকায় সংগঠন বিস্তার— সর্বত্রই বিজেপি কর্মীদের সক্রিয়তা চোখে পড়ছে। অপরদিকে তৃণমূলের একাংশ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠছে। অনেকেই নাকি ঘরছাড়া অবস্থায় রয়েছেন। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।
এই পরিস্থিতিতে জাহাঙ্গীর খান বলেন, ‘‘আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরানোর জন্য। আমরাও বার্তা দিচ্ছি, ঘরছাড়ারা যেন ঘরে ফেরেন। গণতন্ত্রে মানুষই শেষ কথা। ভোট মানুষ দিতে পারত না— এটা বিজেপির মিথ্যে প্রচার ছিল।’’
তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আনছে। তবে সাধারণ মানুষ সব দেখছেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরাই ঠিক করবেন কোন দল ক্ষমতায় থাকবে, এমনটাই বিশ্বাস জাহাঙ্গীরের।
নিজেকে ফলতার ‘ভূমিপুত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘‘ফলতার ভূমিপুত্র আমি। মানুষ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে আছেন, থাকবেনও। মানুষের উপর আশা, ভরসা রয়েছে আমার। ঝড় আসে, ঝড় চলেও যায়। মানুষ যা রায় দেবেন, সেই রায়ই মাথা পেতে নেব।’’
জাহাঙ্গীরের এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ একদিকে যখন বিরোধীরা তাঁর রাজনৈতিক জমি দুর্বল হওয়ার দাবি করছে, ঠিক তখনই তিনি মানুষের সমর্থনের উপর ভরসা রেখে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিলেন।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, ফলতায় এবার লড়াই আগের চেয়ে অনেক কঠিন। ভোটের দিন ও গণনার দিন দলীয় কর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি নিয়ে তৃণমূল শিবিরের মধ্যেই কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে বলে রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক কর্মী ও সমর্থকের নিষ্ক্রিয়তা বা দলবদলের ঘটনাও সামনে এসেছে। যদিও প্রকাশ্যে তৃণমূল নেতৃত্ব এই সমস্ত অভিযোগ মানতে নারাজ।
এদিকে রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে জাহাঙ্গীর খানের সম্পত্তি নিয়ে। বিজেপি নেতা বিধান পাড়ুই অভিযোগ তুলেছেন, জাহাঙ্গীরের আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সম্পত্তির উৎস খতিয়ে দেখা উচিত। সেই কারণেই তিনি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির কাছে লিখিতভাবে তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
বিধান পাড়ুইয়ের দাবি, সাধারণ মানুষের সামনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হলে এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, বহু সম্পত্তির উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং তার সঠিক ব্যাখ্যা সামনে আসা উচিত।
তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দিয়েছেন জাহাঙ্গীর খান। তিনি বলেন, ‘‘এসব আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা। বিষয়টা একসময় আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। আদালত সেই মামলার নিষ্পত্তি করে দিয়েছে। সেই প্রমাণও থানার আধিকারিক ও পুলিশ সুপারকে দিয়েছি।’’
জাহাঙ্গীরের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই ধরনের অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে। তাঁর কথায়, যদি কোনও অনিয়ম থাকত, তাহলে আদালত আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিত। কিন্তু আদালত বিষয়টির নিষ্পত্তি করে দিয়েছে, ফলে নতুন করে ইস্যুটি সামনে আনার পিছনে শুধুই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফলতা কেন্দ্র এবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্যতম হাইভোল্টেজ রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে বিজেপির উত্থান, অন্যদিকে তৃণমূলের পুরনো ঘাঁটি ধরে রাখার লড়াই— সব মিলিয়ে ভোটের আবহ এখন তপ্ত। এর মধ্যেই জাহাঙ্গীর খানকে ঘিরে বিতর্ক ও পাল্টা বিতর্ক রাজনীতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
এখন সব নজর ভোটের ফলাফলের দিকে। মানুষের রায় কোন দিকে যাবে, তা সময়ই বলবে। তবে রাজনৈতিক ঝড়ের মধ্যেও জাহাঙ্গীর খানের বার্তা স্পষ্ট— “ঝড় আসে, ঝড় চলেও যায়।” সেই ঝড়ের পর তিনি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।