পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের মরা গাঙে স্রোত আনতে প্রস্তুত প্রাথমিক পথনির্দেশিকা! চারটি ক্ষেত্রে মূল জোর কেন্দ্রীয় নীতি আয়োগের
আনন্দবাজার | ১৭ মে ২০২৬
দুই থেকে তিন। তিন থেকে নেমে চার। আরও নামতে নামতে এখন ছয়ে। ভারতে উৎপাদনশীলতার তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ কি এ বার উল্টোপথে হেঁটে ফের উপরের দিকে উঠতে পারবে? তেমনটাই কথা দিচ্ছে নতুন বিজেপি সরকার। আর সেই লক্ষ্যেই পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় নীতি আয়োগ, সম্প্রতি যার উপাধ্যক্ষ (ভাইস চেয়ারম্যান) করা হল বাঙালি অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়িকে।
বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বার ক্ষমতায় আসার পরই শিল্প এবং অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে নীতি আয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করতে বলা হয়েছে কেন্দ্রের তরফে। উপাধ্যক্ষ অশোকের নেতৃত্বে সেই কাজ শুরুও হয়ে গিয়েছে। একে ‘সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ব ভারতের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা’ বলছেন কেউ কেউ। অশোকের নিজের কথায়, ‘‘নীতি আয়োগ পশ্চিমবঙ্গের জন্য উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিকাঠামো, নদীভিত্তিক বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের রূপরেখা তৈরি করছে। কলকাতাকে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ প্রবেশদ্বার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।’’
চলতি মাসেই নীতি আয়োগের ভাইসচেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছেন অশোক। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বালুরঘাট থেকে জিতে পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক হয়েছিলেন। কিন্তু এ বার তাঁকে ভোটের টিকিট না-দিয়ে নীতি আয়োগের মাথায় নিয়ে এসেছে মোদী সরকার। কখনও ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে, কখনও পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সদস্য হিসাবে কাজ করা এই অশোকের হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গের শিল্পকে নতুন মাত্রায় তুলে ধরতে চাইছে নয়াদিল্লি। কেন্দ্রের নির্দেশ পাওয়ার পর শিল্পায়নের ‘রোডম্যাপ’ তৈরির জন্য প্রাথমিক আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন অশোকেরা।
পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে বর্তমান দুরবস্থা কারও অজানা নয়। স্বাধীনতার সময় জি়ডিপি-র বিচারে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের দ্বিতীয় ধনীতম রাজ্য ছিল (তার আগে অবিভক্ত বাংলা ছিল একে)। ধারাবাহিক অবনতির পর এখন ষষ্ঠ স্থানে নেমে এসেছে রাজ্য। শিল্প-কলখারখানার হাত ধরে নগরায়নের সূচনার অন্যতম কাণ্ডারি ছিল এই রাজ্য। সেখানে শিল্পের মুখ থুবড়ে পড়ার নেপথ্যে অনেকে শ্রমিক ইউনিয়নের নামে বাড়াবাড়ি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নৈরাজ্য, প্রশাসনিক ভুল সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন। বাম আমলে এরাজ্যে বহু কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। সেই সময়কার উল্লেখ্যযোগ্য শিল্প উদ্যোগ হিসাবে কেউ কেউ সেক্টর ফাইভের নাম করেন। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, তা-ও মূলত কলসেন্টার ভিত্তিক। তৃণমূল আমলে শিল্পের তেমন প্রসার চোখে পড়েনি। বরং, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পর এ রাজ্যে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমেছে। তথ্যপ্রযুক্তির খাতে বড় কোনও সুযোগ এখনও পশ্চিমবঙ্গ তৈরি করতে পারে নি। কৃতী এবং উচ্চাভিলাষী ছাত্রছাত্রীরা কর্মক্ষেত্র হিসাবে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ কিংবা অন্যকোনও শহরকে বেছে নেন। পশ্চিমবঙ্গে সুযোগ নেই তেমন। এ রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার পর্বেও বার বার শিল্পের জরাজীর্ণ দশার কথা তুলে ধরেছে বিজেপি। পরিযায়ী শ্রমিকদের দুরবস্থার সমান্তরালে গুজরাত কিংবা মহারাষ্ট্রের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যের শিল্প-কর্মসংস্থানের ছবি তুলে ধরে ভোট চাওয়া হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর তাই ‘ডবলইঞ্জিন’ সরকারের সুযোগ নিয়ে শিল্পের ‘শূন্যতা’ কাটাতে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্র।
ব্যবসায়ী তথা বিজেপি নেতা শিশির বাজোরিয়া এ প্রসঙ্গেই দ্য স্টেটসম্যানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষ চাকরির পিছনে ছোটেন বলে একটা মিথ প্রচলিত আছে। কিন্তু মানুষ ভুলে যান, এটা বেঙ্গল কেমিক্যালসের পিসি রায় কিংবা ঘনশ্যাম দাস বিড়লার মতো উদ্যোক্তাদের দেশ। আমরা সেটাই আবার জাগিয়ে তুলতে চাই। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্বএশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ন্যাচারাল হাব কলকাতা।’’ পূর্বতন সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘দীর্ঘ দিন এ রাজ্যে সে ভাবে বৃহৎ উৎপাদনের বিনিয়োগ হয় নি। সরকারও শিল্প সম্প্রসারণের পরিবর্তে ধারাবাহিক ভাবে উন্নয়নমুখী প্রকল্পের রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছে।’’
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সল্টলেক এবং নিউ টাউনের আইটি হাব কিছুটা আশার আলো জাগিয়েছে। নতুন কিছু সংস্থা সেখানে ভিড় জমিয়েছে। তা ছাড়া, কৃষি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের খাতেও আশা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেন ট্রেড-এর বিশ্ব বাণিজ্য সংগঠন বিভাগের প্রাক্তন প্রধান তথা অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ধর দ্য স্টেটসম্যানকে বলেন, ‘‘কৃষির এই খাতে বৃদ্ধির হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ। তাই এই সমস্ত খাতে উন্নয়ন হলে চাষিদের আয় বাড়বে। কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে চলে যাওয়ার প্রবণতাও কমবে।’’ নতুন ধরনের চা, প্রসেস্ড চিজ এবং ব্যান্ডেলের দিকে উৎপন্ন কিছু পণ্যের মাধ্যমে রফতানি বৃদ্ধির কথা ভাবা যায় বলে মনে করছেন বিশ্বজিৎ।
নীতি আয়োগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গের নতুন শিল্পায়নে মূলত চারটি বৃহত্তর সেক্টরে মনোনিবেশ করা হচ্ছে। তার মধ্যে অন্যতম হল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ। এ রাজ্য বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটানের মতো দেশের সঙ্গে ভারতকে যুক্ত করে। রাজ্যের এই অবস্থানকেই ‘অর্থনৈতিক সম্পদ’ হিসাবে দেখা হচ্ছে। কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের পরিকাঠামো, পণ্যবাহী করিডর কী অবস্থায় রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উৎপাদন ক্ষেত্র একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা অবশ্যই। ইঞ্জিনিয়ারিং, রসায়ন, বস্ত্র এবংবৈদ্যুতিন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন উদ্যোগ প্রয়োজন। নীতি নির্ধারণকারীদের কেউ কেউ পূর্ব ভারতের খনিজ বলয়ের সঙ্গে যুক্ত সেমিকন্ডাক্টর করিডরের কথাও বলছেন।মনে রাখা দরকার, উৎপাদন শিল্পেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। তৃতীয়ত, কয়লা এবং লৌহ আকরিক সমৃদ্ধ বলয়ের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নৈকট্য, বন্দরের সুবিধা এবং বঙ্গোপসাগরের জ্বালানি পথের কাছে এই রাজ্যের অবস্থানকে শিল্পের ক্ষেত্রে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞেরা। একে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান তৈরির উপর জোর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর আলাদা করে নজর দেওয়া হবে। যাঁরা কাজের অভাবে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে দক্ষিণ বা পশ্চিম ভারতে পাড়ি দিয়েছেন অথবা চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের কর্মসংস্থান কেন্দ্রের শিল্পভাবনার অন্যতম লক্ষ্য।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ পশ্চিমবঙ্গে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সংবেদনশীলতা নিয়ে সতর্কও করছেন। এ রাজ্যে দুর্বল শিল্প পরিকাঠামো, পুরসভা ও পঞ্চায়েতের দুর্বল আর্থিক ভিত্তি এবং আমলাতান্ত্রিক জড়তা শিল্পায়নে সমস্যা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, ভোটের ফলাফলে বিনিয়োগকারীদের কারও কারও আস্থা বেড়েছে। তবে প্রশাসনিক বাস্তবায়নের উপরেই সরকারি পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে। কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব, তা সময় বলবে।