• নীরবে বসেই ভোট পরিচালনা, পদ্ম শিবিরের জয়ের চর্চায় ত্রয়ী
    বর্তমান | ১৮ মে ২০২৬
  • শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: অশোকনগর বিধানসভা আসনে বিজেপির জয়কে ঘিরে রাজনীতিতে শুরু হয়েছে আলোচনা। দীর্ঘদিনের তৃণমূল কংগ্রেসের ‘শক্ত ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত এই কেন্দ্রে এবার বিজেপি প্রার্থী ডাঃ সুময় হীরা জয়ী হয়েছেন ৯,৪০০ ভোটে। ফল ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে—এই উলটপুরাণ কি শুধুই ভোটের ঢেউ? দলীয় অন্দরমহলের একাংশের দাবি, অশোকনগরের এই জয়ের পিছনে কাজ করেছে একটি সমন্বিত ‘ওয়ার রুম’। 

    প্রচারের আলো যতটা বাইরে ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ছিল গোপন পরিকল্পনা। বুথভিত্তিক ডেটা বিশ্লেষণ, মাঠ সংগঠন এবং ডিজিটাল ক্যাম্পেইন—এই তিন স্তম্ভকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল পুরো নির্বাচনি ব্লু-প্রিন্ট। আর এই কাঠামোর কেন্দ্রে উঠে আসছে ‘ত্রয়ী’র নাম। 

    ত্রয়ীর প্রথম মুখ সুজয় দে। বারাসত সাংগঠনিক জেলা বিজেপি কমিটির পরিচিত সংগঠক মুখ। তিনি বারাসত জেলা বিজেপির সদস্য পদে আছেন। দলীয় অন্দরে তাঁকে ঘিরে পরিচিতি মূলত ‘ব্যাকএন্ড স্ট্র্যাটেজি’র নেতা হিসাবে। প্রকাশ্যে প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও সংগঠনের ভিতরে তাঁর ভূমিকা দৃঢ়। ভোটপর্বে বুথভিত্তিক ডেটা বিশ্লেষণ, এলাকা ধরে রাজনৈতিক প্রবণতা নির্ধারণ এবং কৌশলগত ইনপুট তৈরির কাজে তিনি ছিলেন সক্রিয়। 

    কোন এলাকায় কী ধরনের প্রচার হবে, কোথায় সংগঠনকে শক্ত করতে হবে—এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল তাঁর বিশ্লেষণ। ময়দানের খবর পৌঁছে যেত তাঁর টেবিলে। আর সেখান থেকেই তৈরি হত পরবর্তী দিনের নির্দেশিকা। এমনটাই দলীয় সূত্রের দাবি।

    অন্যদিকে দ্বিতীয় মুখ ভাস্বতী সোম। তিনি বারাসত সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সহসভাপতি। দলের একাংশ তাঁকে দেখেন ‘মোবিলাইজেশন স্পেশালিস্ট’ হিসেবে। রোড শো, জনসভা, মিছিল থেকে শুরু করে বুথস্তরের কর্মী সমন্বয়—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর হাতেই। 

    তৃতীয় মুখ স্বর্ণেন্দু চক্রবর্তী। বিজেপির আইটি সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই ছাত্রনেতা ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রের প্রধান কারিগর অশোকনগরে। আধুনিক নির্বাচনে যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল ন্যারেটিভ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, সেখানে স্বর্ণেন্দুর ভূমিকা ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচার বার্তা তৈরি, কনটেন্ট ডিস্ট্রিবিউশন, নির্দেশিকা দ্রুত কর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং অনলাইন ক্যাম্পেইন পরিচালনা—সবকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলেছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। 

    এই তিনজনকে ঘিরে একটি সক্রিয় ওয়ার রুম টিম প্রতিদিন বুথভিত্তিক রিপোর্ট তৈরি করত। সেই রিপোর্ট বিশ্লেষণ করেই বদলানো হত প্রচারের দিক—কোথায় আক্রমণ বাড়বে, কোথায় সংগঠন পুনর্গঠন হবে, কোথায় নীরব কৌশল নিতে হবে। আর গোটা কেন্দ্রের পর্যবেক্ষক ছিলেন উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী লোকেশ প্রজাপতি। 

    এদিকে, রাজনৈতিক ইতিহাসের দিক থেকেও অশোকনগর বিজেপির কাছে তাৎপর্যপূর্ণ কেন্দ্র। এই বিধানসভা থেকেই রাজ্যে প্রথম বিজেপি বিধায়ক হন বাদল ভট্টাচার্য (১৯৯৯–২০০১)। দীর্ঘ বিরতির পর আবার এই কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রত্যাবর্তনকে পদ্মপার্টি বড় সাফল্য হিসাবেই দেখছে। 

    ফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলের একাংশের মূল্যায়ন, অশোকনগরের এই জয় শুধুই মাঠের শক্তির ফল নয়, বরং তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা, সংগঠিত ওয়ার রুম ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজির এক সুসংহত রাজনৈতিক অপারেশন। সেই সমীকরণের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিজেপির আলোচিত এই ত্রয়ীর নাম। এনিয়ে সুজয় বলছেন, দল যা দায়িত্ব দিয়েছে সেটা করেছি। তবে এই জয়ের মূল কান্ডারি হলেন দলের বুথ স্তরের কর্মীরা। তাঁরাই দিনরাত পরিশ্রম করে প্রার্থীকে জিতিয়েছেন।  নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)