• গঙ্গার ঘাট থেকে ভাঙা পাড়, ‘ডবল ইঞ্জিনের’ সহায়তায় পরিবেশবান্ধব সৌন্দর্যায়নের আশা
    বর্তমান | ১৮ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: প্রায় এক যুগ আগে কলকাতার গঙ্গাপাড়ের একাংশের সৌন্দর্যায়ন হয়েছিল। মায়ের ঘাট, নিমতলা ঘাট, বাবুঘাট, রতনবাবুর ঘাট সহ একাধিক ঐতিহ্যমন্ডিত ঘাটের সংস্কারও হয়েছিল তখন। কিন্তু গত কয়েক বছরে এসব গঙ্গার ঘাট ও সংলগ্ন অঞ্চলের বেহাল দশা প্রকট হয়েছে। তেমনই বহু অংশে বিপজ্জনকভাবে ভেঙেছে গঙ্গার পাড়। তাই রাজ্যে পালাবদলের পর নতুন সরকার এবার কলকাতার গঙ্গাপাড়ের সৌন্দর্যায়নে পদক্ষেপ করবে বলে আশাবাদী নাগরিক মহল। 

    নিমতলা, আহিরীটোলা, শোভাবাজার সহ শহরের বেশ কয়েকটি গঙ্গাঘাটের অবস্থা ভালো নয়। ঘাটগুলির একাংশ চলে গিয়েছে নদীগর্ভে। বিপদের আশঙ্কায় নিমতলা ঘাটের একাংশ ঘিরে রাখা হয়েছে বেশ কয়েক বছর। নিমতলা থেকে জগন্নাথঘাটের দিকে যাওয়ার পথে গঙ্গাপাড়ের ভাঙন প্রকট। বন্দরের জমি, ঘাট সংলগ্ন একাধিক মন্দির, বন্দরের জমিতে থাকা বিভিন্ন গুদাম, কুস্তির আখড়া তলিয়ে গিয়েছে গঙ্গায়। নিমতলা থেকে বাগবাজার পর্যন্ত একাধিক ঘাটের অবস্থাও বেহাল। সিঁড়ি ভেঙে গিয়ে ঘাটগুলি বিপজ্জনক হয়ে রয়েছে। পাড় বরাবর পাঁচিল নেই বহু জায়গায়। এই পরিস্থিতিতে বিগত সরকারের আমলেই কলকাতা পুরসভার তরফে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন ঘাট এবং পাড় বাঁধানোর আর্জি জানানো হয়েছিল। প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠনের পরই বাবুঘাট থেকে প্রিন্সেপ ঘাট পর্যন্ত সৌন্দর্যায়ন হয়। তখন কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার থাকার কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সেই কাজ করেছিল কলকাতা পুরসভাই। সুদৃশ্য আলো, বসার জায়গা, পেভার ব্লকের পথ, দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যে সেজে উঠেছিল গঙ্গাপাড়। কিন্তু গত কয়েক বছরে বন্দর কর্তৃপক্ষ পুরসভাকে আর পাড় সংস্কার বা সৌন্দর্যায়নের অনুমতি দেয়নি। পরে ঠিক হয়, একাধিক ঘাটের সংস্কার বন্দর কর্তৃপক্ষই করবে। সেই মতো কুমোরটুলি ঘাট, নিমতলা ঘাট সহ বিভিন্ন ঘাটের সংস্কারের দায়িত্ব বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে তুলে দেয় তারা। কিন্তু অভিযোগ, যতদিন তৃণমূল ক্ষমতায় ছিল, ততদিন সেই কাজের গতি ছিল শ্লথ। রাজ্যে পালাবদলের পরই সেই কাজে গতি এসেছে। কিন্তু বাগবাজার, কাশী মিত্র শ্মশানঘাট, রতনবাবুর ঘাট সহ কাশীপুর অঞ্চলের বিভিন্ন ঘাট ও সংলগ্ন রাস্তার ভগ্নদশা তাদের নজরে আসেনি। 

    এই অবস্থার পরিবর্তন চাইছে নাগরিক সমাজ। আহিরীটোলা ঘাটে নিয়মিত আড্ডা জমান শুভ্রাংশু, সন্দীপ, ঋতপারা। চলে দেদার গানবাজনাও। পাইকপাড়ার বাসিন্দা, পেশায় ওয়েব ডিজাইনার সন্দীপ ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘কলকাতার গঙ্গাপাড় ও ঘাটের পরিবেশ অন্যরকম। এখানকার আবহ, এই আড্ডা, গানবাজনা বাঙালিরই কালচার। তবে এখানে উন্নয়ন প্রয়োজন। পাড় ভাঙছে, ঘাটের সিঁড়িগুলির অবস্থাও বেহাল। দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। নতুন সরকারের কাছে আশা, তারা গঙ্গাপাড়ের সৌন্দর্যায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নেহা ঘোষের কথায়, ‘ডবল ইঞ্জিনের সরকারের প্রতিশ্রুতির এবার বাস্তবায়ন চাই। কলকাতার সংস্কৃতি, এখানকার ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই করে গঙ্গার ঘাটের উন্নয়ন হোক। দৃষ্টিনন্দন হোক গোটা অঞ্চল। তবে এই ভাইবটা যেন থাকে।’ 

    বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী ডঃ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী বলেন, ‘কলকাতায় গঙ্গার ঐতিহাসিক ঘাটগুলির আধুনিকীকরণ দরকার। তবে তা যেন নদীর ইকোসিস্টেমে ক্ষতি না করে। ঘাটে পর্যাপ্ত বায়ো-টয়লেট, ডাস্টবিন এবং বর্জ্য পৃথকীকরণের ব্যবস্থা রাখা উচিত। কংক্রিটের পরিবর্তে ইকো-ফ্রেন্ডলি রিভারফ্রন্ট  তৈরি করা দরকার। অর্থাৎ প্রাকৃতিক ঘাস, দেশীয় গাছ, বাঁশ ও মাটির ঢাল ব্যবহার করে নদীর পাড় বাঁচাতে হবে। নদীর ধার ঘেঁষে বড়ো গাছ, জলজ উদ্ভিদ ও ঝোপঝাড় লাগিয়ে একটি সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা যেতে পারে। আশা করব, নতুন সরকার এই বিজ্ঞানসম্মত, পরিবেশবান্ধব উপায়েই উন্নয়ন করবে।’ 
  • Link to this news (বর্তমান)