বামের ‘ধর্ম-সঙ্কট’ বোঝালেন বেবি, এল রাজ্য কমিটিতেও
আনন্দবাজার | ১৮ মে ২০২৬
কেন্দ্রে ক্ষমতা হাতে পেয়ে বিজেপি যা করছে, শুধু তার বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াই বা জোটের কৌশল ঠিক করলেই চলবে না। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবকর সঙ্ঘের (আরএসএস) নিঃশব্দ কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখতে হবে। কলকাতায় বেশ কিছু দিন আগে বক্তৃতায় ব্যাখ্যা করে গিয়েছিলেন সিপিএমের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাট। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পরে প্রথম বার রাজ্যে এসে সিপিএমের বর্তমান সাধাকণ সম্পাদক এম এ বেবি এ বার পরামর্শ দিলেন, ধর্মে বিশ্বাসীদের পুরোপুরা বাইরে রেখে বাম আন্দোলনকে এগোনো যাবে না। ভাবতে হবে তাঁদের কথাও।
বিধানসভা নির্বাচনের সিপিএমের রাজ্য কমিটির প্রথম পর্যালোচনা বৈঠক বসেছিল শনি ও রবিবার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে। আগামী সপ্তাহে ২২ থেকে ২৪ মে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে কেরল, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, অসম ও পুদুচেরির বিধানসভা ফল নিয়ে পর্যালোচনা হওয়ার কথা। সূত্রের খবর, তার আগে রাজ্য কমিটির বৈঠকে ভোটের ফল নিয়ে বিশেষ কিছু বলতে চাননি সাধারণ সম্পাদক। জোর দিয়েছেন জেলার নেতা ও প্রতিনিধিদের মত শোনার উপরে। তবে প্রারম্ভিক ভাষণে বেবির মত, তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি ও অপশাসন থেকে মুক্তি পেতে বাংলার মানুষ পরিবর্তন চেয়েছেন। বেছে নিয়েছেন বিজেপিকে। হিন্দু ভোটের অভূতপূর্ব সমাহার ঘটেছে বিজেপির বাক্সে। সব মিলিয়ে ২২টি রাজ্যে তারা এখন ক্ষমতায়। বিজেপিকে যাঁরা ভোট দিচ্ছেন, তাঁর মধ্যে গরিব, প্রান্তিক, খেটে খাওয়া অনেক মানুষই আছেন। এই সূত্রেই বেবির পরামর্শ, ধর্মে বিশ্বাস রাখেন বা ধর্ম পালন করেন, এমন মানুষের কাছেও বামেদের পৌঁছতে হবে। শুধু নাস্তিক যাঁরা, তাঁদের নিয়েই বাম আন্দোলন বা রাজনীতি চালানোর ভাবনা বদলাতে হবে। প্রসঙ্গত, সিপিএমের পার্টি কংগ্রেসে এর আগে এই সংক্রান্ত দলিল পেশ করেছিলেন দলের তৎকালীন পলিটব্যুরো সদস্য সূর্যকান্ত মিশ্র। মন্দির, মসজিদ বা গির্জা পরিচালনা সংক্রান্ত পরিষদ বা কমিটি নিয়ে বামেদের নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করার কথাও বলা হয়েছিল।
সিপিএম সূত্রের খবর, সাধারণ সম্পাদকের মতের সুরে কথা উঠে এসেছে রাজ্য কমিটির আলোচনাতেও। একাধিক জেলার প্রতিনিধিরাই বলেছেন, প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার মনোভাব এ বার মানুষের মধ্যে প্রবল ছিল। সিপিএমের প্রার্থী পছন্দ হলেও তাঁদের ভোট দিলে জিতবেন কি, এই প্রশ্ন মানুষের মনে ছিল। তাই ভোটের শতাংশ হার সর্বত্র বাড়েনি, কিছু কেন্দ্রে ভাল লড়াই হয়েছে। তার পাশাপাশি, ‘জন্ম যদি হিন্দু কুলে, ভোট দাও পদ্ম ফুলে’—এই প্রচার ভাল রকম কার্যকরী হয়েছে বলে রাজ্য কমিটির সদস্যদের অনেকের মত। জেলা ও গণসংগঠনের নেতাদের একাংশ তারই পাশাপাশি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, শূ্ন্যের গেরো কাটিয়ে সিপিএম একমাত্র আসন জিতেছে সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত ডোমকলে। কিন্তু তাঁদের প্রশ্ন, সংখ্যালঘু ভোট পেতে দল যতটা যত্নবান হয়েছে, অন্য ক্ষেত্রে ততটা হয়েছে কি? তাতে সাধারণ হিন্দু মনে বামেদের সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়ে থাকতে পারে। বিজেপি এখন ক্ষমতায় এসেছে। তৃণমূলের জায়গায় অন্য একটা সংখ্যালঘু-নির্ভর শক্তি হিসেবে সিপিএম বিরোধিতা করছে— এই ধারণা জনমানসে তৈরি হলে বিজেপির সুবিধা হতে পারে, সে কথা মাথায় রেখে এগোনোর কথা বলছেন দলের ওই অংশ।
বৈঠকের জবাবি বক্তৃতায় সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, দলের সব অংশের মতামত নিয়ে আগামী ২৯-৩০ অগস্ট কল্যাণীতে রাজ্য কমিটির বর্ধিত অধিবেশন ডাকা হবে। নতুন রাজ্য সরকারের নানা পদক্ষেপ প্রসঙ্গে বৈঠকের পরে রবিবার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সেলিম বলেছেন, ‘‘সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় ভেবেচিন্তে, আর্থিক দিক দেখে। যে ভাবে জোর-জুলুম করে করা হচ্ছে, সেটা বেঠিক। হকার উচ্ছেদের ক্ষেত্রেও আমাদের সেটাই বক্তব্য। একটা সময়সীমার কথা আগে থেকে বলে দিতে হয়।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘বিজেপি সরকারি পদে নিয়োগ, শিল্প তৈরির মতো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, চাকরি দেবে বলেছিল। সেই প্রতিশ্রুতি যেন আগে পালিত হয়।’’ নোটিস না-দিয়ে বাড়ি ভাঙা, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ ও বুলডোজ়ার-রাজের প্রতিবাদে এ দিনই সন্ধ্যায় তপসিয়ায় মিছিলে শামিল হয়েছিলেন সেলিম, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, শতরূপ ঘোষ, দীপু দাস, আফরীন বেগম (শিল্পী) প্রমুখ।