বিপুল সংখ্যারিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে প্রথম বিজেপি সরকার। শাসকের আইন নয়, আইনের শাসনই এখন বলবৎ হবে বলে ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গে জমানা বদল ও বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠার পরে প্রথম ইদুজ্জোহা পালিত হতলে চলেছে চলতি মাসে। তার আগে নতুন সরকারের জারি করা দু’টি বিজ্ঞপ্তি ঘিরে বিভ্রান্তি ও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে নানা মহলে। এই পরিস্থিতিতে আইন মেনে চলা এবং শান্তিতে উৎসব পালন করার জন্য আবেদন জানাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশিই তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, পুরনো আইনই মেনে চলার কথা বলা হয়েছে সরকারের তরফে। বিজেপি সরকার নতুন কিছু করেনি।
রাজ্যে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরেই ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’ মেনে চলা এবং রাজ্যের আইনি কসাইখানাগুলিকে ৮ দফা নির্দেশ ‘কঠোর ভাবে পালন করা’র নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারই পাশাপাশি, ধর্মীয় বা কোনও অনুষ্ঠানে মাইক-বিধি কড়া ভাবে যাতে মেনে চলা হয়, তা দেখতে বলা হয়েছে প্রশাসনকে। এই নির্দেশিকার প্রেক্ষিতে নানা স্তরে বিতর্ক ও কিছু বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। রাজ্য সরকারকে চিঠি দিয়েছেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী, কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরী এবং সিপিএমের বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমান (রানা)। ‘জুলুমবাজি’র পথে না-যাওয়ার জন্য নতুন সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও। সরকারি সূত্রের খবর, পরিস্থিতির উপরে নজর রেখে রাজ্য জুড়েই পুলিশ-প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলছেন, ‘‘বিভ্রান্তি বা বিতর্কের কিছু নেই। নাখোদা মসজিদের ইমাম যা বলার, বলে দিয়েছেন। এই বিষয়ে আমাদের আর মন্তব্য করার কিছু নেই।’’ সেই সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘‘মনে রাখতে হবে, পশু জবাই সংক্রান্ত আইন বিধানচন্দ্র রায়ের আমল থেকে আছে। নতুন কিছু করা হয়নি। মাইকের ক্ষেত্রেও শব্দবিধি অনেক আগে থেকেই বাঁধা আছে। মেনে চলতে হবে এগুলো। রাজ্য সরকার কোনও অশান্তি চায় না। আইনের শাসনই চলবে।’’ প্রশাসনিক বৈঠকে ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী বার্তা দিয়েছেন, পুলিশের গায়ে হাত দেওয়ার খবর যেন আর শুনতে না হয়! এই সপ্তাহে অন্যান্য প্রশাসনিক বৈঠকেও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে দেওয়া হবে বলে সূত্রের খবর।
সামনে ধর্মীয় পরব প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘আইন মেনে চলুন, শান্তিতে উৎসব পালন করুন। কোথাও অসুবিধা হলে প্রশাসনকে জানান।’’
শান্তিরক্ষার আবেদন জানিয়েই নাখোদা মসজিদের ইমাম মৌলানা মহম্মদ শফিক কাশমি বলেছেন, ‘‘পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন ছিলই। বিজেপি নতুন কিছু করেনি। এই আইনের ফলে কুরবানি কঠিন হবে। আমি তাই আবেদন করতে চাই, কুরবানি এবং গো-মাংস খাওয়া বন্ধ রাখুন।’’ একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘‘সরকারের কাছে আবেদন করব, গরুকে ‘জাতীয় পশু’ ঘোষণা করে সব ধরনের গো-হত্যা, পাচার বা গো-মাংসের রফতানি বন্ধ করা হোক। মন্দিরেও বলি বন্ধ করা হোক। তা হলে এত বছর ধরে চলে আসা তর্ক বন্ধ হবে। দ্বিমুখী ব্যবস্থা চলতে পারে না। শুধু মুসলিমদের নানা বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হবে, আবার বড় বড় জবাইখানা চালিয়ে গো-মাংস রফতানিতে বিশ্ব বাজারে ভারত দ্বিতীয় স্থানে থাকবে, মাংস খাওয়ার অপরাধে কাউকে পিটিয়ে মারা হবে— এগুলো ঠিক নয়।’’ আর ধর্মীয় উপাসনায় মাইক ব্যবহার প্রসঙ্গে ইমাম বলেছেন, ‘‘দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ শিল্প-বাণিজ্যের এলাকা, আবাসিক এলাকা বা নিঃশব্দ এলাকার জন্য শব্দবিধি ঠিক করে দিয়েছে আগেই। সুপ্রিম কোর্টেও তা মান্যতা পেয়েছে। সেই বিধি সকলেরই মেনে চলা উচিত। পুলিশের কাছে আবেদন, শব্দবিধি মেনে চলার বিষয়টা দেখুন। মাইক খুলে নেওয়া হবে কেন?’’
পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক-দলের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সূত্রের খবর, তৃণমূলের কিছু মহল থেকে বার্তা গিয়েছে কংগ্রেস নেতা অধীরের কাছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে চিঠি দিয়ে কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ অধীর বলেছেন, ‘সরকারের বিজ্ঞপ্তি মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা তৈরি করেছে’। নির্দেশিকার জেরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগের কথা জানিয়ে চিঠিতে তাঁর প্রস্তাব, ‘মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় প্রশাসন নির্দিষ্ট কিছু স্থান চিহ্নিত ও নির্ধারিত করতে পারে, যেখানে মানুষ তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত প্রথা পালন করতে পারবেন’। পাশাপাশি, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সেলিম দলের রাজ্য দফতরে বলেছেন, “রাজ্যে গো-রক্ষার নামে জুলুমবাজি শুরু হয়েছে। নতুন সরকারকে বলব, এই পথে যাবেন না। সামাজিক ভারসাম্য, সম্প্রীতি যাতে বিঘ্নিত না-হয়, তা দেখতে হবে। সরকারি নির্দেশিকার জেরে বহু ছোট হাটে বিকিকিনি বন্ধ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গো-পালকেরা।” ওই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারের দাবি করেছে এসইউসি।