সরকার বদল হতেই রেলের জায়গা থেকে হকার উচ্ছেদ অভিযানে গতি
আনন্দবাজার | ১৮ মে ২০২৬
রাজ্যে পালাবদলের পরে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতেই রেলের পরিসর থেকে দখলদার হটানোর প্রক্রিয়া আচমকা গতি পেয়েছে। নতুন সরকার কাজ শুরু করার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই হাওড়া এবং শিয়ালদহ ডিভিশনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে অভিযান চালিয়ে হাজারেরও বেশি অস্থায়ী ঝুপড়ি এবং ছোট দোকান উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে রেল সূত্রের খবর। শনিবার রাতে হাওড়া স্টেশনের প্রবেশপথ লাগোয়া অংশে অভিযান চলে। প্রায় সাড়ে পাঁচশো দোকান উচ্ছেদ করা হয়। রেলের তরফে জানানো হয়েছে, দখলদারদের সরে যাওয়ার কথা বলে আগে একাধিক বার নোটিস দেওয়া হয়েছিল। যদিও দখলদারদের পাল্টা দাবি, রেল আচমকা উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে। অনেকেই দোকানের বিভিন্ন জিনিসপত্র সরিয়ে রাখার সময়টুকু পাননি। রেল পুলিশ এবং রেলরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতিতে জেসিবি ব্যবহার করে ওই সব দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
হাওড়া ছাড়াও শনিবার দুপুরে অভিযান চলে শিয়ালদহ ডিভিশনের সোনারপুর এবং শিয়ালদহ স্টেশনে। গত এক সপ্তাহের মধ্যে হাওড়া, শিয়ালদহ, সোনারপুর ছাড়াও ব্যান্ডেল, চুঁচুড়া, বর্ধমান-সহ বিভিন্ন স্টেশনে ওই অভিযান চলেছে। শিয়ালদহ ডিভিশনের বালিগঞ্জ, বিধাননগর রোড-সহ একাধিক স্টেশন থেকে বেআইনি দখলদারদের উচ্ছেদ করতে রেলের তরফে নোটিসদেওয়া হয়েছে।
হাওড়া স্টেশন চত্বর থেকে শনিবার বেশি রাতে বুলডোজ়ার দিয়ে দখলদারদের হটিয়ে দেওয়ার পরে রবিবার স্টেশনের বাইরের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। এত দিন স্টেশনে ঢোকার মুখে যে পথে হকারদেরডালা, খাবারের দোকান পেরিয়ে ট্রেন ধরতে গিয়ে প্রতি মুহূর্তে যাত্রীদের ধাক্কা খেতে হত, এ দিন সেই অংশ ছিল পুরোপুরি ফাঁকা।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে আদালতের নির্দেশ মতো স্টেশনের বাইরের ও ভিতরের রাস্তা হকারদের দখলমুক্ত করার চেষ্টা হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি বলে রেল সূত্রের দাবি। হাওড়ায় গত কয়েক দিন ধরে মাইকে আরপিএফের পক্ষ থেকে হকারদের মালপত্র নিয়ে উঠে যাওয়ার জন্য বলা হলেও তাতে পুরোপুরি সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ। রেলের বক্তব্য, যাঁরা জিনিসপত্র সরাননি, তাঁদের ক্ষেত্রেই বলপ্রয়োগ করতে হয়েছে। আরপিএফ ছাড়াও রেল পুলিশ এবং হাওড়া সিটি পুলিশের উপস্থিতিতে এই উচ্ছেদ অভিযান চলে। লিলুয়া রেল কলোনিতেও এ দিন দখলদার হটাতে অভিযান চলে।
রেলকর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, দখলদার হটানোর ক্ষেত্রে অতীতেও পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে অভিযান চালানো হত। কিন্তু রেলের অভিযোগ ছিল যে, হকারদের সরাতে তাঁরা তৎপর হলেও এই কাজ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা দেখা দিতে পারে, এই যুক্তি দেখিয়ে স্থানীয় প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয় না।
বালিগঞ্জ এবং সোনারপুর স্টেশনের বহু হকারের দাবি, তাঁদের স্টেশন থেকে উঠে যেতে হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বাঘা যতীন স্টেশনের এক হকার বলেন, ‘‘প্রায় ২৫ বছর ধরে এখানে খাবারের দোকান চালাচ্ছি। এখন উঠে যেতে বললে না খেয়ে মরতে হবে।’’
হকার সংগঠন সূত্রের খবর, অতীতে রেলের পক্ষ থেকে হকারদের সতর্ক করা হলেও এমন তৎপরতা চোখে পড়েনি। রেলের হকারদের দাবিদাওয়া নিয়ে প্রায়ই আন্দোলন করে থাকে ‘জাতীয় বাংলা সম্মেলন’। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সিদ্ধব্রত দাস বলেন, ‘‘নতুন সরকার সোনার বাংলা গড়তে চান। কিন্তু তার জন্য যেন গরিব মানুষের পেটে লাথি না পড়ে।’’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ট্রেনে ঘুরে যে হকারেরা পণ্য বিক্রি করেন, তাঁদের প্রায়ই জরিমানা করা হচ্ছে। অনেকেই কাজে যাচ্ছেন না। সিটুর শ্রমিক সংগঠনও হকারদের সমস্যা নিয়ে পথে নেমেছে। সংগঠনের অভিযোগ, উচ্ছেদের নামে আরপিএফ হুমকি দিচ্ছে। বিভিন্ন স্টেশনে হকারদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা চলছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হকারদের বড় অংশ বিজেপির শ্রমিক সংগঠন হিন্দ মজদুর সঙ্ঘের দিকে ঝুঁকেছেন। ওই সংগঠন সূত্রে জানা যাচ্ছে,নতুন সরকার পুরোদস্তুর কাজ শুরু করা পর্যন্ত তাঁরা সময় দেওয়ারকথা বলেছেন।
রেলের আধিকারিকদের অবশ্য দাবি, স্টেশন পরিচ্ছন্ন রাখা ছাড়াও যাত্রীদের হাঁটাচলা করার পরিসর বাড়াতে এই অভিযান চলছে।