• বড়বাজারে নজর পড়বে কি, চর্চা তিলজলা-কাণ্ডে
    আনন্দবাজার | ১৮ মে ২০২৬
  • প্রতি বছর অন্তত সাত থেকে আট বার! কখনও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, কখনও বাড়ি ভেঙে পড়া, কখনও আবার হোটেলের বেআইনি ভবনের ভিতরেই ঘুমের মধ্যে আবাসিকদের মৃত্যু— এ ভাবেই একের পর এক মর্মান্তিক ও বিতর্কিত ঘটনার জেরে শিরোনামে উঠে আসে বড়বাজার তথা চিৎপুর অঞ্চল। স্থানীয়দের দাবি, মাঝারি বা ছোট ঘটনা তো আকছার ঘটছে বড়বাজারে। তবু এখানকার চেহারা বদলায় না। ঘিঞ্জি গলি, তারের জটে আকাশের মুখ দেখা কঠিন। এমন পরিস্থিতিতেই পর পর মাথা তোলে বেআইনি বহুতল। সঙ্গে দখল হওয়া ফুটপাত, ‘দাহ্য স্তূপ’ হয়ে থাকা দেদার প্লাস্টিকের ছাউনির নীচে কোনও রকম অগ্নি-নির্বাপণ বন্দোবস্ত ছাড়াই ব্যবসা চলে রমরমিয়ে।

    তিলজলায় বেআইনি চামড়ার কারখানায় প্রাণহানির ঘটনার পরে ওই বেআইনি বহুতল ভাঙতে নতুন সরকার বুলডোজ়ার পাঠানোর জেরে চর্চায় উঠে এসেছে বড়বাজার। অনেকেরই বক্তব্য, গত কয়েক বছরে বড়বাজারেও দফায় দফায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কোনও রকম অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই সেখানেও বেআইনি বাণিজ্যিক ভবনে দেদার ব্যবসা চলছে। একের পর এক মৃত্যুর ঘটনাতেও তেমন কোনও কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

    নবান্নে হকার সংক্রান্ত বৈঠকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধু বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘বড়বাজারের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? পুলিশ কমিশনারকে বলছি, ব্যবস্থা নিন।’’ কিন্তু তার পরেও যে-কে-সেই পরিস্থিতি! প্রশ্ন ঘুরছে, এ বার কি এই পরিস্থিতি বদলাবে? তিলজলার মতো বড়বাজারের ক্ষেত্রেও কি পদক্ষেপ করবে প্রশাসন? রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেছেন, ‘‘বেআইনি ভবনে যেখানে যেখানে বাণিজ্যিক কাজ চলছে, তার সবই চিহ্নিত করা হচ্ছে। কড়া পদক্ষেপ করা হবে।’’

    চিৎপুর, বড়বাজার, নাখোদা মসজিদের আশপাশের এলাকা, বাগড়ি মার্কেট, ক্যানিং স্ট্রিটের মতো জায়গাগুলিতে ঘুরে দেখা গেল, হাঁটাচলা করার পরিসরটুকুও নেই সেখানে। একাধিক জায়গায় ফুটপাত দখল করে নির্মাণ, বিধি বহির্ভূত ভাবে বাড়িয়ে নেওয়া ছাদের অংশ। এমন একাধিক বাড়ি চোখে পড়ে, যা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই সেগুলির ভিতরে কতগুলি তলা রয়েছে। বাগড়ি মার্কেট সংলগ্ন এমনই একটি বহুতলের সামনে দাঁড়িয়ে স্থানীয় রতন সোনকর বললেন, ‘‘এখানে ৭৫ শতাংশ ব্যবসায়িক বহুতল, ২৫ শতাংশে লোকের বাস। তবু ব্যবসায়ীদের দাপটে এখানে টেকা দায়। নানা কায়দায় টাকা ওঠে বলেই ব্যবসায়ীদের বেআইনি কাজে লাগাম টানা হয় না।’’

    এই বাগড়ি মার্কেটেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই চত্বর ঘুরে নন্দরাম মার্কেটের কাছে পৌঁছে দেখা গেল, অগ্নিকাণ্ডের অভিজ্ঞতা থাকলেও সেখানকার ফুটপাত দখলমুক্ত হয়নি। উল্টে প্লাস্টিকের ছাউনির নীচে ডালা পেতে পাকাপাকি বন্দোবস্ত রয়েছে। পাশের ত্রিপল পট্টিতেও বিধি মানার বালাই নেই। প্রশ্ন রয়েছে সেখানকার ফুটপাতের দোকানের বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও।

    অভিযোগ, ফুটপাতের দোকানে বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছেন স্থায়ী দোকানের বাসিন্দারাই। যেখানে বিদ্যুতের লোড পরীক্ষার কোনও ব্যবস্থাই নেই। ফলে যে কোনও মুহূর্তে শর্ট সার্কিটের আশঙ্কা থাকছে। অথচ প্রশাসনের সে দিকে নজরই নেই বলে অভিযোগ।

    অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বড়বাজারের একাধিক বহুতলের ভিতরের অবস্থাও বিন্দুমাত্র পাল্টায়নি। দেখা গেল, নিয়ম উড়িয়েই ব্যবসায়িক সামগ্রী ফেলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সিঁড়ির পথ। ছাদে যাওয়ার দরজায় তালা। ফলে বিপদের সময়ে বেরোনোর পথ নেই। অভিযোগ রয়েছে দমকলের ভূমিকা নিয়েও।

    বড়বাজারের বাসিন্দা স্নেহা সপ্রু বললেন, ‘‘এখানকার বেশির ভাগ বাড়িরই দমকলের ছাড়পত্র নেই। বিধি মেনে বাড়ি তৈরির বিষয়টি দেখার কথা টেকনিক্যাল এক্সপার্ট কমিটির (টিইসি)। কিন্তু তাদের ভূমিকানিয়েও প্রশ্ন প্রচুর।’’ এই চত্বরে ঘুরলে পুলিশের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ শোনা যায়। বেআইনি পার্কিং থেকে বেআইনি নির্মাণ— পুলিশ দেখেও দেখে না বলে অভিযোগ।

    তবে এক বাসিন্দার প্রত্যয়ী মন্তব্য, ‘‘নতুন সরকার এসেই আইনি পার্কিং সরাচ্ছে দেখছি। বড়বাজারের হাঁসফাঁস অবস্থা কিছুটা কাটছে। তবে পাকাপাকি দখলমুক্ত করতে হবে।’’
  • Link to this news (আনন্দবাজার)